সম্পাদকীয়

বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারকে অান্তরিক হতে হবে

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী: কোনো দেশের জনশক্তির তুলনায় কর্মসংস্থানের স্বল্পতার ফলে সৃষ্ট সমস্যাই বেকার সমস্যা। বর্তমান বাংলাদেশে এই সমস্যা জটিল ও প্রকট আকার ধারণ করেছে। যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কর্মহীন এই বিশাল উদ্বৃত্ত জনশক্তি না পারছে দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে, না পারছে নিজের সুন্দর-সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নির্মাণ করতে। বেকারত্বের অসহ্য যন্ত্রণায় তারা জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র দেখা দিচ্ছে বিশৃংখলা। ক্রমবর্ধমান এই সমস্যা সমাধানে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো যেকোনো সময় ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়বে।
বেকারত্ব বলতে মূলত বোঝায় কর্মক্ষম শ্রমশক্তির পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, “Unemployment (or joblessness) occurs when people are without work and actively seeking work.” The Bureau of Labour Statistics (BLS) বেকারত্বের সংজ্ঞায় বলেছে- ‘বেকারত্ব হচ্ছে এমন কিছু মানুষের কর্মহীন অবস্থা; যাদের কোনো কর্ম নেই, গত চার সপ্তাহ যাবত সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করছে এবং তারা কাজের জন্য প্রস্তুত।’ বাংলাদেশের শ্রমশক্তি সম্পর্কিত জরিপে (এলএফএস) বেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এমন ব্যক্তিকে যার বয়স ১০ বছর কিংবা তার বেশি; কাজের জন্য প্রস্তুত থেকে সক্রিয়ভাবে কাজের অনুসন্ধান করেও যে কাজের সুযোগ পায়নি বা কাজ করতে পারেনি। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সামাজিক অবকাঠামো, বেকারত্বের সংজ্ঞা, কারণ ও বৈশিষ্ট্যের বিচারে বেকারত্ব বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত দুর্বলতার ফলে সৃষ্টি হয় অবকাঠামোগত বেকারত্ব। হঠাৎ কোনো মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা স্থানান্তরের ফলে আকস্মিক বেকারত্বের সৃষ্টি হয়। কারিগরি বা প্রযুক্তিগত অপর্যাপ্ততার দরুণ বেকার সমস্যা তৈরি হয়। তৈরি পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য মৌসুমি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা দেয় মৌসুমি বেকারত্ব। আবার কাজের ধরণের সঙ্গে শ্রমশক্তির দক্ষতার অসঙ্গতির ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরণের বেকারত্ব। তবে বাংলাদেশে কাঠামোগত বেকারত্বের হারই বেশি।বর্তমান বাংলাদেশে বেকার সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

উচ্চশিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছেন, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়। এতে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারে ভারত এ অঞ্চলে তৃতীয় (৮ দশমিক ৪ শতাংশ), শ্রীলংকা চতুর্থ (৭ দশমিক ৯ শতাংশ), ব্রুনাই পঞ্চম (৭ দশমিক ৫ শতাংশ), ফিলিপাইন ষষ্ঠ (৭ দশমিক ৫ শতাংশ), ইরান সপ্তম (৭ দশমিক ৪ শতাংশ), মঙ্গোলিয়া অষ্টম (৭ শতাংশ), লাওস নবম (৬ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং ফিজি দশম (৫ দশমিক ১ শতাংশ)। বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন পর্যায়ে বেকারত্বের হার কত, তাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পার হয়নি- এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১ দশমিক ৮ শতাংশ)। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যারা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকার সাড়ে ৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেড় যুগ আগে ২০০০ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের হিসাবে এই হার একই থাকে (৪ দশমিক ৪ শতাংশ)। বাংলাদেশে পুরুষের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও নারীর ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ আবার নিষ্ক্রিয়। তারা কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে এই হার বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি।

বাংলাদেশে বেকার সমস্যা সৃষ্টির পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো- ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব: ২০০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসনের সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরমভাবে অবহেলিত হয়েছে। উপরন্তু তারা শোষণ করে নিয়ে গেছে এদেশের মূল্যবান সম্পদ। ফলে ক্রমেই ভেঙে পড়েছে অর্থনৈতিক অবকাঠামো আর বেড়েছে বেকারত্বের চাপ। শিল্পবিপ্লবের প্রভাব: শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অধিক উৎপাদনমুখী যন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছে। ফলে আধুনিক কৃষিব্যবস্থা জনশক্তির পরিবর্তে কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। শ্রমিকের প্রয়োজন যন্ত্রে পূরণ করায় সৃষ্টি হচ্ছে বেকার সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধোত্তর চাপ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো চরমভাবে ভেঙে পড়ে। যুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশে শিল্পায়নে গতিহীনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অদক্ষতার দরুন বিশাল একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ে। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশকে এখনও তাড়িয়ে ফিরছে। অধিক জনসংখ্যা: বাংলাদেশে বেকার সমস্যার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসংখ্যার সীমাহীন চাপই মূলত এর জন্য প্রধানত দায়ী। যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় অসঙ্গতি: বাংলাদেশের শিক্ষার হার কম। তদুপরি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এতে নেই বৃত্তিমূলক, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ। বছর বছর সনদধারী শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি হলেও তৈরি হচ্ছে না যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তি।
অপরিকল্পিত উৎপাদন ব্যবস্থা: কৃষকের অসচেতনতা ও অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার বেকার সমস্যার অন্যতম কারণ। জমির উর্বরতা হ্রাস, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি উৎপাদন শক্তিহীন হয়ে যাওয়ায় নষ্ট হয় কাজের সুযোগ। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত দুর্বলতা: সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে উদ্যোগহীনতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, সীমাহীন দুর্নীতি প্রভৃতি কারণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। যার ফলে বাড়ছে বেকারত্বের চাপ।
কায়িক শ্রমে অনীহা: কায়িক শ্রমের প্রতি অনীহা বেকার সমস্যার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। অভাব অনটন সত্ত্বেও এদেশের মানুষ কায়িক পরিশ্রম করতে আগ্রহী নয়। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে বেকার হয়ে বসে থাকে, কিন্তু নিজেই আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ভাগ্যোন্নয়নে উদ্যোগী হয় না।

বেকারত্ব একটি অভিশাপ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সর্বত্র এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেকারত্বের ভয়াল থাবায় দুর্বল হয়ে পড়ে রাষ্ট্রকাঠামো। বেকারত্বের কারণে কোনো কাজ না পেয়ে মানুষ নানা অবৈধ ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। সমাজে খুন-গুম, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। স্থবির হয়ে যায় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা। দেখা দেয় শাসনতান্ত্রিক বিশৃংখলা। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে প্রভাবশালী দেশগুলো। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে। যথা- যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। অধিক জনসংখ্যাকে দেশের বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বৃত্তিমূলক, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে। নারী শিক্ষার সম্প্রসারণে যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।কোনো কাজকেই তুচ্ছ না ভেবে কায়িক পরিশ্রমের মর্যাদা দিতে হবে।পরিকল্পিত শিল্পকারখানা গড়ে তুলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়তে তুলতে হবে। ভাষাগত দুর্বলতা দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারে কর্মসংস্থ্না প্রাপ্তিতে একটি বড় সমস্যা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাষাগত দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে হবে। কর্মক্ষম শ্রমিকদের বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষিত যুবসমাজকে গ্রামমুখী করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেটে আউটসোর্সিং হতে পারে বেকারত্ব হ্রাসের আরেকটি উপায়।

বেকারত্বের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকার ও সমগ্র জাতিকেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলীয়করণের মনোবৃত্তি পরিহার করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মে নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বেকারত্ব থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক : এম.ফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Show More

MSKnews24.com desk

জনপদে জনগণের কণ্ঠস্বর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close