সম্পাদকীয়

দেশের স্বার্থেই নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী :: ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দিব’ -নেপোলিয়ান বোনাপোর্ট এর এই চিরস্মরণীয় উক্তিটি আমাদের সবার জানা। একজন শিক্ষিত নারী একটি পরিবারকে শিক্ষিত করতে পারে। এ জন্য আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘একজন পুরুষ মানুষকে শিক্ষা দেওয়া মানে একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করে তোলা, আর একজন মেয়েকে শিক্ষা দেওয়া মানে একটি গোটা পরিবারকে শিক্ষিত করে তোলা।’ পৃথিবীর অর্ধেক জনসমষ্টি নারী। তাই মানব জাতির সামগ্রিক কল্যাণের কথা মাথায় রেখে বলা যায়, নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নারী শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনাতীত। কেননা নারী মানব জাতির অর্ধেক অংশ। জনসমষ্টির অর্ধেককে শিক্ষার বাইরে রেখে সমাজের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই অর্ধেক জনগণকে সুশিক্ষিত করতে না পারলে জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি ও কল্যাণ আসতে পারে না।

যুগের পরিক্রমায় নারী শিক্ষার গুরুত্ব বর্তমানে অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। নারীর অবস্থান সমাজে চিরকাল ধরেই অবহেলিত এবং পশ্চাদপদ। নারীর এই অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা অর্জন করে নারী তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হবে। তাই নারীর উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক উপাদান হলো নারী শিক্ষা। নারীকে স্বাবলম্বী হতে হলে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। কেননা কর্মসংস্থানই নারীর আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারে। নারীর জন্য যুগোপযোগী কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সময়ে সরকার নারীর জন্য কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে যা শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নারীর কর্মে প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ৬০% নারী শিক্ষক নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যা নারীর কর্মসংস্থানের একটি বিরাট সুযোগ। একটি পরিবারের সুরক্ষায় একজন শিক্ষিত নারী একটি সুরক্ষিত দুর্গের মতো কাজ করে। কারণ একজন সুশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্য সচেতন। আর একজন স্বাস্থ্য সচেতন মা, স্ত্রী বা বোন তার সন্তান, স্বামী বা ভাই-বোনকে সব সময় সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট থাকেন। আবার একজন শিক্ষিত মা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সর্বদা চিন্তিত থাকেন এবং সে অনুযায়ী সন্তানকে চালিত করেন। সন্তানের চলাফেরা, নিয়মানুবর্তীতাসহ যাবতীয় বিষয় খেয়াল করেন। ফলে সন্তান মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। একজন সুশিক্ষিত নারী সুরক্ষিত পরিবারের জন্য খুবই প্রয়োজন। সন্তান জন্মের পর থেকে মায়ের সংস্পর্শেই বেশির ভাগ সময় থাকে। মায়ের আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথাবার্তা সব কিছুই সন্তানকে প্রভাবিত করে। মায়ের হাতে সন্তানের শিক্ষার হাতে খড়ি। মা যদি শিক্ষিত হন তাহলে সন্তান অবশ্যই শিক্ষিত হবে। একজন নারী শিক্ষিত হওয়ার অর্থ ওই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষিত হবে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনসমষ্টিকে শিক্ষার মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া বর্তমানে সময়ের দাবী। নারীকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করলে দেশ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার নারী শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।মানুষ জ্ঞানী বা শিক্ষিত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। মানুষকে জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এ জন্য হাদিসে বলা হয়েছে ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর উপর ফরজ।’ ইসলামে পুরুষের মতো নারীর জন্যও শিক্ষা লাভ করা ফরজ করা হয়েছে। যেখানে পুরুষের শিক্ষার প্রসঙ্গে এসেছে সেখানে নারীদের শিক্ষার কথাও বলা হয়েছে। নবী করিম (স.) এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত নারী। বিয়ে করার সময় মেয়ের শিক্ষার দিকে নজর দেওয়ার জন্য রাসূল (স.) নির্দেশ দিয়েছেন।

যেকোনো সমাজকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়কেই তার অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নারী শিক্ষাই পারে সমাজের সকল স্তরের নারীদেরকে তাদের সামাজিক অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে। নারী শিক্ষার বিষয়টি এখনও আমাদের সমাজে বেশ কন্টকাকীর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো নিম্নরূপ- সচেতনতার অভাব: নারী শিক্ষার প্রসারে প্রধান অন্তরায় হলো গণসচেতনতার অভাব। নারী শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ এখনো অসচেতন। বাল্য বিবাহ: মেয়েদেরকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরানোর আগেই বাবা-মা মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেন ফলে এক মেয়ের পক্ষে কাংক্ষিত শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হয় না। ধর্মীয় গোঁড়ামী: ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে। নারী ঘরে থাকার জন্য বা নারী ঘরের বাইরে গেলে পাপ এসব কথা বলে মেয়েকে বিদ্যা অর্জন থেকে বিরত রাখা হয়।মেয়েদের প্রতি নীচু ধারণা: মেয়েরা ছেলেদের থেকে দুর্বল, কম মেধাবী মেয়েদের সম্পর্কে এ ধরণের ধারণা নারী শিক্ষার জন্য বাধা।

নারী শিক্ষার প্রসারে আমাদের করণীয়: নারী শিক্ষার প্রসারে আমাদের করণীয় সমূহ নিম্নরূপ-সচেতনতা বৃদ্ধি:নারী শিক্ষার গুরুত্ব বুঝিয়ে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারনা চালাতে হবে। নারীকে শিক্ষিত করে তুললে কী ধরণের লাভ হবে আর না করলে কী ক্ষতি হবে তা সবাইকে বুঝাতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন: নারী শিক্ষার প্রসারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। নারীকে পুরুষের থেকে উত্তম মনে করে নারী বা মেয়েদেরকে অবহেলা করার মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের এগিয়ে আসা দরকার: শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের পশ্চাদপদতার অন্যতম কারণ হলো ধর্মীয় গোঁড়ামী। এই গোঁড়ামী দূর করার জন্য ধর্মীয় নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।মেয়ে ছেলে বৈষম্য হ্রাস: শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী পুরুষ বা ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো ধরণের বৈষম্য করা উচিত নয়। ছেলে হোক মেয়ে হোক সব সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য বাবা-মাকে এগিয়ে আসতে হবে।

একটি সমাজের সার্বিক অগ্রগতির জন্য নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নারী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধ্যান ধারণা ও মানসিকতা সবচেয়ে বড় বাধা। প্রত্যন্ত গ্রাম ও মফস্বল থেকে যে সব মেয়ে উচ্চ শিক্ষার আশায় শহরে পাড়ি জমায় অনেক ক্ষেত্রেই তারা আশাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদী বিষয় কোর্স, আবাসন সমস্যা, সেশন জট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি বিষয় ছাত্রীদেরকে মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই এ সব বাধা দূর করে আমাদের নিজেদের সাথেই নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আর এ জন্য নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : এম.ফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Show More

MSKnews24.com desk

জনপদে জনগণের কণ্ঠস্বর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close